নড়বড়ে বাঁধের বেষ্টনীতে জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের ফসল

এম এ মান্নান, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) থে‌কে
  • আপডেট রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২
  • ৩০ দেখেছে

দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত। বিস্তীর্ণ পাগনার হাওরের সবুজ ধানসায়রে দোলা দিচ্ছে মায়াবী ধানের শীষ। আর ক’দিন পরই হাওরের অগণিত গোপাট মুখরিত হয়ে উঠবে কিষাণ-কৃষাণি আর ভাগালুদের পদচারণায়। সুনামগঞ্জের সবকটি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলার এতদাঞ্চলের লাখো লাখো মানুষের জীবিকায়নের প্রধান অবলম্বন এই ধান ফসল। জামালগঞ্জ কৃষি বিভাগ জানায়, এই পাগনার হাওরে এবছর প্রায় ১৩হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ হয়েছে। এতে প্রায় ৬০কোটি টাকা মূল্যের ৫০হাজার ১শ মেট্রিকটন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

এদিকে স্থানীয়রা প্রমাদ গুনছেন সোনালী ধান গোলায় না উঠা পর্যন্ত হাওর জনপদে স্বস্তি আসবে না। কারণ গত দুুু’দিনে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের মনে কাঁপন শুরু হয়ে গেছে। আর এতে দূশ্চিন্তার কারণ হয়ে কৃষকের বুকে হাতুরি পেঠাচ্ছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাওর বাঁধ প্রকল্প।

র‌বিবার (২৭ মার্চ) পাগনার হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে পিআইসির বাঁধ সম্পাদনের ব্যাপক অনিয়ম অসঙ্গতি দেখা যায়। দায়সারা গোছের এসব বাঁধ নির্মানে বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেকই পিআইসিরা ব্যয় করেনি বলে কৃষকেরা অভিযোগ জানিয়েছেন। স্থানীয়রা আরো জানিয়েছেন, বিগত সময়ে এসব ডুবন্ত বাঁধের গোড়ার কাঠামো প্রায় অক্ষতই রয়ে গেছে। তবে বাঁধের উপরি ভাগ গেলো বর্ষায় অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুরমা নদীর তীরবর্তী আলীপুর বোগলাখালী ক্লোজার থেকে পূর্বদিকে প্রায় ১০ কি.মি. জুড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড যেসব প্রকল্প দিয়েছে এবং যে পরিমাণে মাটি ফেলা হয়েছে তাতে অর্ধেক টাকার কাজও পিআইসিররা করেনি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পাগনার হাওর দক্ষিণ প্রান্তে এসব বাঁধের গাঁঘেষে রয়েছে দিরাই সীমানার পিয়াইন নদী। এটি একেঁবেঁকে বোগলাখালী ক্লোজার হয়ে দীর্ঘতম সুরমা নদীতে সংযুক্ত। বোগলাখালী ক্লোজারটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যদি এই ক্লোজারটি কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে বোগলাখালীর পূর্বাংশে পিয়াইন নদীতে পানি ঢুকে সকল বাঁধ ভেঙ্গে পাগনার হাওর তলিয়ে যেতে পারে। তবে ঝুকি এড়াতে বোগলাখালী ক্লোজারটিতে প্রায় ৪০লাখ টাকার দুটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। ক্লোজারে ৩৪নং এবং ৩৫নং প্রকল্পের কার্পেটিং এর কাজ কিছুটা বাকি আছে। সরজমিন বাঁধে গেলে ৩৪নং পিআইসির সভাপতি আসাদ আলী এবং ৩৫ নং পিআইসির সদস্য সচিব জামাল উদ্দিনকে প্রকল্প স্থানে পাওয়া যায়। তারা ক্লোজার বাঁধের দুপাশে ও উপরি ভাগে কার্পেটিং করাচ্ছেন। ক্লোজার বাঁধের কাজ গোছানো এবং দৃষ্টিনন্দন দেখা গেছে। দুপাশে বাঁশের আড়গুলোও ঘন আকারে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দিরাই কালিয়াকোটা হাওরের পানি বিকল্প পথে এসে অথবা উজানের বৃষ্টির পানির ঢল এসেও পিয়াইন নদীর লাগোয়া ২৮নং, ৩০নং,৩৩নং সহ সকল পিআইসির বাঁধ প্রকল্পে আঘাত হানতে পারে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কারণ এসব প্রকল্পে পিআইসিরা ভালোভাবে কাজ করেনি। বোগলাখালী ক্লোজারের পূর্বদিকে ঢাইল্যার স্লুইসগেট হয়ে করাইট্যার দিকে দিরাই খাগাউড়ার নিকটবর্তী ফুইল্যাটানার বাঁধ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে খামখেয়ালির বাঁধ দিয়েছেন পিআইসির লোকজন। সেসব বাঁধে বড় বড় চাকা মাটি ফেলে কোথাও আদৌ দূরমুজ করা হয়নি। সর্বত্র বাঁধের উপরিভাগে ফাটল ধরে আছে। যা ভারী বৃষ্টিতে ধ্বসে যেতে পারে। অপরদিকে অনেকাংশেই বাঁধের দুপাশে ঘাস লাগানো হয়নি। কেবল যেনতেন ভাবে এলোমেলো মাটি ভরাট করেই পিআইসির লোকজন দায় সেরে প্রকল্প এলাকা ত্যাগ করে চলে এসেছেন। এছাড়া হাওর অভ্যন্তরে কয়েকটি বাঁধের সাইনবোর্ড অথবা পিআইসির কাউকে না পাওয়ায় এসব বাঁধ প্রকল্পের তথ্য পাওয়া যায়নি। পাগনার হাওর রক্ষায় নয়াহালট নিকটবর্তী ২৫নং পিআইসির সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। বাঁধে বাঁশের আড়ের বেষ্টনীও যথাযথ নেই।২৬নং পিআইসির কাজ শেষ। আলীপুর ঢালার ২৭নং পিআইসির বিষয়ে স্থানীয়রা বলেছেন, বালি মাটি দিয়ে গড়া বাঁধে দুরমুজ দেওয়া হয়নি। অধিকাংশ স্থানে ঘাস লাগানো হয়নি। এই প্রকল্পের কোন সাইনবোর্ডও নেই। এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থানীয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে সকল
পিআইসিকে বরাদ্ধের প্রায় ৪৩% টাকা পরিশোধ করা হয়ে গেছে। অথচ পাগনার হাওরে অনেক বাঁধের কাজ এখনও যথাযথ সম্পন্ন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কতিপয় পিআইসি। সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এদিকে গত ২৬মার্চ সন্ধ্যা থেকে পরদিন বেলা ১১টা পর্যন্ত সুরমা নদীর তীরবর্তী গজারিয়া অরক্ষিত স্লুইসগেটের কপাট ভেঙ্গে প্রবল বেগে পাগনার হাওরে পানি প্রবেশ করছিল। এতে স্থানীয়দের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।পরদিন বেলা ১১টার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের জামালগঞ্জ উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসও রেজাউল কবীর এসে স্লুইসগেটের কপাট মেরামত করেন।

এব্যাপারে হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, পিআইসি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতায় যদি বিগত ২০১৭ সালের মতো পাগনার হাওরের সোনার ফসল তলিয়ে যায় তবে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সংক্রান্ত আরও খবর

ফেইসবুক পেজ

error: Content is protected !!